কুরআন কেন মুহাম্মদ (সাঃ)-এর নিজস্ব রচনা নয়?: যুক্তি ও প্রমাণ
আমরা মুসলিম হিসেবে বিশ্বাস করি কুরআন হচ্ছে আল্লাহর বাণী। কিন্তু যারা মুসলিম নয় অথবা মুসলিম হলেও ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী নয় তারা মনে করে যে কুরআন রচনা করেছে মুহাম্মদ (সা) নিজে। তিনি বানিয়ে বানিয়ে কুরআন রচনা করেছেন আর সেগুলো আল্লাহর বাণী হিসেবে চালিয়ে দিয়েছেন। যারা কুরআনকে মুহাম্মদ সা: এর রচনা বলে দাবী করেন তাদের একটা বড় যুক্তি হচ্ছে কুরানের বহু বিষয় অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ যেমনঃ বাইবেল, সিরিয়াক খ্রিস্টীয় গ্রন্থ, জরথুস্ট্রবাদ, সাবিয়ান ধর্ম থেকে ধার করা হয়েছে। কারো মতে মুহাম্মদ (সা.) তৎকালীন কোন পন্ডিত ব্যাক্তি যেমন ওয়ারাকা ইবন নাওফল (খ্রিস্টান), বাহিরা (খ্রিস্টান সন্ন্যাসী), সালমান ফারসি (পার্সিয়ান), আব্দুল্লাহ ইবন সালাম (ইহুদি) এইসব ব্যাক্তির কাছ থেকে শুনে অনেক তথ্য কুরআনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এই আর্টিক্যালটিতে আমরা নিরপেক্ষ ভাবে বিশ্লেষণ করে দেখব কুরআন কি মুহাম্মদ সাঃ এর নিজস্ব রচনা করা গ্রন্থ নাকি আল্লাহ প্রদত্ত ঐশ্বরিক কোন গ্রন্থ।
যদি ধরে নেই মুহাম্মদ সা নিজেই কুরআন রচনা করেছেন এবং নিজেকে নবী হিসেবে দাবী করেছেন, তবে কুরআনে তার ব্যাপক প্রশংসা, গুণগানে ভরপুর থাকার কথা। তার কোন ভুল আচরণের কথা কুরআনে থাকার কথা নয়। কুরআন মুহাম্মদ সাঃ এর নিজের বাণী হলে তিনি নিজেকে নিয়ে বেশী আলোচনা করতেন, নিজেকে গ্লোরিফাই করার চেষ্টা করতেন এবং অন্যান্য নবীদের তুলনায় নিজেকে বেশী শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে চাইতেন। অথচ কুরআনে মুহাম্মদ সাঃ নিয়ে খুব কম কথা আলোচনা করা হয়েছে। মুহাম্মদ সাঃ এর চাইতেও অনেক বেশী আলোচনা করা হয়েছে অন্যান্য নবীদের কথা। একটা পরিসংখ্যানে বিষয়টি স্পস্ট হবে-
- মুসা (আঃ): কুরআনের ৩৭টি সূরায় প্রায় ১৩৬ বার উল্লেখ করা হয়েছে
- ইব্রাহিম (আঃ): ২৫টি সূরায় ৬৯ বার উল্লেখ করা হয়েছে
- নূহ (আঃ): ২৮টি সূরায় ৪৩ বার উল্লেখ করা হয়েছে
- ঈসা (আঃ): ১৫টি সূরায় ২৫ বার উল্লেখ করা হয়েছে
- মুহাম্মদ (সাঃ): মাত্র ৪-৫ বার নামসহ উল্লেখ করা হয়েছে
কুরআনে নবী মুহাম্মদ সাঃ কে নিরক্ষর বা উম্মি নবী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উম্মি (Umi/Ummi) শব্দটি আরবি মূল ‘উম্মুন’ (মা) থেকে এসেছে, যার সাধারণ অর্থ হলো নিরক্ষর, লেখাপড়া না জানা ( Unschooled) বা এমন ব্যক্তি যিনি মানুষের কাছে আনুষ্ঠানিক কোনো লেখা বা পড়ার বিদ্যা শেখেননি। সূরা আরাফে রাসূলকে একজন ‘উম্মী’ বা নিরক্ষর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘”যারা সেই নিরক্ষর রাসূলের অনুসরণ করে চলে যার কথা তারা তাদের নিকট রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীল কিতাবে লিখিত পায়, যে মানুষকে সৎ কাজের নির্দেশ দেয় ও অন্যায় কাজ করতে নিষেধ করে,…… সূরা আরাফ আয়াত ১৫৭
রাসূল সাঃ ইতিপূর্বে কোন বই পড়েন নি বা কোন কিছু লিখেন নি বলে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে- সূরা আনকাবু্তের ৪৮ নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে ” তুমিতো এর পূর্বে কোন কিতাব পাঠ করনি এবং স্বহস্তে কোন দিন কিতাব লিখনি যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করবে।” — কুরআন নাযীলের সময় রাসূলের বয়স ছিল ৪০ বছর, এর আগে রাসূল কোন বই পড়েন নি এবং কোন কিছুই রচনা করেন নি। সাধারণত যারা কবি-সাহিত্যিকে হিসেবে পরিচিতি লাভ করে তারা ছোটবেলা থেকেই কাব্য রচনায় অভ্যস্ত থাকে। মুহাম্মদ সা: এর যে কোন একাডেমিক বা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছিল না বলে কুরআনে বার বার বলা হচ্ছে। কিন্তু কুরআন যদি নবী মুহাম্মদ সা: নিজেই রচনা করতেন তবে তিনি অবশ্যই তাঁর এই বিষয়গুলি এড়িয়ে যেতেন , বরং নিজেকে অনেক জ্ঞানী , বিভিন্ন কিতাবের পন্ডিত হিসেবে প্রমাণ করতে চাইতেন। কারণ সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করতে চাইলে বা কোন মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাইল নিজেকে অনেক পন্ডিত আর জ্ঞানী হিসেবেই প্রমাণ করার চেষ্টা করাটাই যুক্তিযুক্ত। সেটা না করে কুরআনে রাসূলকে নিরক্ষর হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে। এটা প্রমাণ করে কুরআন রাসূল সাঃ এর নিজস্ব বাণী নয়।
পৃথিবীর যে কোন ধর্ম অথবা যে কোন মতবাদ নিয়ে যত বই পুস্তক আছে সবগুলোতেই সেই ধর্ম বা মতবাদের প্রতিষ্ঠাতাদের জীবন নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হয়ে থাকে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কুরআনের মূল আলোচ্য বিষয় মুহাম্মদ সাঃ এর জীবনী নয়। এমনকি কুরআনে ইসলামের পূর্ণ বিজয়ের পেছনে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রাখা রাসূলের অসংখ্য সঙ্গী সাথীদের ত্যাগ তিতিক্ষা, রক্তপাত এবং আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম, যুদ্ধ ইত্যাদি নিয়ে খুব সামান্য আলোচনা করা হয়েছে। হযরত আবু বকর রাঃ, উমর রা, উসমান রাঃ, আলী রাঃ, বেলাল রাঃ থেকে শুরু করে প্রথম শ্রেণীর কোন সাহাবীর নামই কুরানে উল্লেখ করা হয় নি। অথচ তাদের সাহায্য- সহযোগীতা ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। একটি হিসাব অনুযায়ী কুরানের মাত্র ১% থেকে ২% আয়াতে মুহাম্মদ সাঃ এবং তাঁর সঙ্গী সাথীদের কথা বলা হয়েছে। এমনকি হুযুর সাঃ এর স্ত্রী হযরত খাদীজা রাঃ যিনি ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে মুহাম্মদ সাঃ কে ব্যাপকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন তাঁর ব্যাপারেও কুরআনে কিছুই উল্লেখ করা হয় নি। মুহাম্মদ সাঃ কুরআন রচনা করলে সেখানে তাঁর সঙ্গী সাথীদের কথা অনেক বেশী পরিমাণে থাকার কথা ছিল।
কুরআন নাযীলের পর পাগল, কবি, যাদুকর, মিথ্যাবাদী হিসেবে অবিহিত করাঃ
কুরআন নাযীলের পর থেকে মুহাম্মদ সাঃ কে মানুষ পাগল, কবি, যাদুকর, মিথ্যাবাদী হিসেবে অবিহিত করতে থাকে যে কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে- “আর তারা বলে, ‘একজন পাগল কবির জন্য কি আমরা আমাদের উপাস্যদের ছেড়ে দেব?’” (সূরা আস-সাফফাত: ৩৬)। সূরা সাদ (৩৮:৪) — “তারা বিস্ময়বোধ করেছে যে, তাদের মধ্য থেকেই একজন সতর্ককারী তাদের কাছে এসেছে। আর কাফিররা বলে, ‘এ তো এক যাদুকর, মিথ্যাবাদী।
নবী মুহাম্মদ (সা:) কুরায়েশ গোত্রের সন্তান। কুরায়েশ ছিল ইসলামপূর্ব আরবের সবচেয়ে সম্মানিত ও প্রভাবশালী গোত্র, যারা মক্কা নিয়ন্ত্রণ করত এবং কাবা ঘরের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল। একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের ব্যাক্তিকে পাগল, কবি, মিথ্যাবাদী বা যাদুকর হিসেবে বললে সেটি তার জন্য মোটেও আনন্দদায়ক বিষয় হবে না। কিন্তু কুরআন নাযীলের পর মুহাম্মদ সাঃ কে এসব কথাই বলা হতো এবং তিনি মারাত্মক মনে ব্যাথা পেতেন । সূরা আল-আন‘আমে বলা হয়েছে “আমি জানি যে, তারা যা বলে তা তোমাকে দুঃখিত করে… (৬:৩৩)”। কাজেই দেখা যাচ্ছে কুরআনের প্রচার মুহাম্মদ সাঃ এর জন্য অনেক সুনাম আর সম্মান নিয়েছে বিষয়টি এরকম নয়, বরং আল্লাহর একত্ববাদ প্রচারের পর থেকেই মুহাম্মদ সাঃ কে বয়ে বেড়াতে হয় লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, মৃত্যুর ভয়। পরিশেষে মৃত্যুর ভয়ে তাঁকে মক্কা থেকে মদীনায় পালিয়ে যেতে হয়। এমনটি বেশীরভাগ নবী-রাসূলের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। আল্লাহর বাণী আর একত্ববাদ প্রচারের বিষয়টি কোন কালেই মানুষ এপ্রিশিয়েট করে নি।
মুহাম্মদ সাঃ কে সতর্ক করে আয়াত নাযীলঃ
পৃথিবীতে এমন কোন বই নেই যেখানে বইয়ের লেখক নিজে নিজেকে সতর্ক করেছে। অথচ কুরআনের বেশ কয়েকটি এমন আয়াত আছে যেখানে মুহাম্মদ সাঃ কে সতর্ক করে নাযীল করা হয়েছে।
মুহাম্মদ সাঃ একবার আল্লাহ ইচ্ছা করলে বা ইনশাল্লাহ বলতে ভুলে যান দেখে বেশ কিছুদিন আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নাযীল বন্ধ ছিল এবং তাঁকে সতর্ক করে আয়াত নাযীল করা হয়েছিল-
রাসূলুল্লাহ ﷺ একবার কুরাইশের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সাথে কথা বলছিলেন। এমন সময় একজন অন্ধ সাহাবী (আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রা.) এসে রাসূল ﷺ-এর কাছে দ্বীনের জ্ঞান শিখতে চাইলেন। রাসূল ﷺ সাময়িকভাবে তার দিকে মনোযোগ না দিয়ে (মুখ ভার করে ও মুখ ফিরিয়ে) নেতাদের সাথে কথা চালিয়ে যান। তখন আল্লাহ তা’আলা এই সূরা আবাসার প্রথম ১২ আয়াতে আয়াতগুলো নাজিল করে রাসূলকে সতর্ক করা হয়।
স্ত্রীদের সাথে একবার এক বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুহাম্মদ সা শপথ করলেন যে তিনি কখনও মধু পান করবেন না। আল্লাহ তাআলা তখন সূরা তাহরীমে সতর্ক করে আয়াত নাযীল করেন যে আল্লাহর হালাল করা জিনিসকে হারাম করার অধিকার কারো নেই। এমন কি রসূল (সাঃ)-এরও এই অধিকার নেই। সূরা আত -তাহরীমের ১ নাম্বার আয়াতেও মুহাম্মদ সা কে সতর্ক করা হয়েছে-
হে নবী, আল্লাহ তোমার জন্য যা হালাল করেছেন তোমার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি কামনায় তুমি কেন তা হারাম করছ?
আর আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
আমরা আর কোনো ধর্মগ্রন্থে এমন উদাহরণ পাই না, যেখানে সেই ধর্মের প্রধান প্রচারকের কোনো ভুলের কথা এতবার উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেই ভুলের জন্য ধর্মের ঈশ্বর বা দেবতা তাকে বার বার সতর্ক করে দিয়েছেন—যা পরবর্তীকালে সেই ধর্মগ্রন্থের অংশ হয়ে যায়। বরং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে প্রচারকদেরকে ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে, অতিমানবীয় স্তরে উন্নীত করা হয়েছে। মুহাম্মদ সাঃ যদি নিজেই কুরান রচনা করতেন, তাহলে কখনই নিজেকে সতর্ক করে এইসব আয়াত লিখতে না।
কুরআনে সৃষ্টিতত্ত্ব, মানুষের ভ্রূণতত্ত্ব, মহাকাশবিদ্যা নিয়ে আলোচনা
পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মগ্রন্থেই এইসব বিষয় নিয়ে কম-বেশী আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু কুরআনের সাথে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের পার্থক্য হচ্ছে, অন্যান্য ধর্মগ্রন্থে অনেক ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে, সেখানে কুরআনে সম্পূর্ণ সঠিক আর তখনকার মানুষের কাছে অনেক অজানা তথ্য দিয়েছে।
কুরআনে সৃষ্টিতত্ত্ব, মহাকাশ, চিকিৎসা বিজ্ঞান, মানুষের ভ্রূণতত্ত্ব ইত্যাদি নিয়ে বেশ অনেকগুলো আয়াত আছে। কুরআন নাযিলের যুগে আরবে নিজস্ব বিজ্ঞানচর্চা খুব সীমিত ছিল। কিন্তু পার্শ্ববর্তী বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য ও সাসানীয় পারস্য এ গ্রিক অ্যারিস্টটল, গ্যালেন, টলেমি জ্ঞানের প্রভাব ছিল প্রবল। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল। নীচের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হবে কুরআন সেইসময়ের প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো তো উল্লেখ করেই নি, বরং এমন সব তথ্য দিয়েছে যা সেই সময়ে ছিল সম্পূর্ণ অজানা। মুহাম্মদ সাঃ নিজে কুরআন রচনা করলে কখনই এইসব বৈজ্ঞানিক তথ্য কুরআনে থাকত না।
প্রাণের মূল উৎস পানি-
যেমন কুরআনে বলা হয়েছে- “আল্লাহ সমস্ত জীবন্ত প্রাণীকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন (সূরা নুর- ২৪ঃ৪৫, সূরা আম্বিয়া- ২১ঃ৩০ )”। এই তথ্যটি বৈজ্ঞানিকভাবে সম্পূর্ণ সঠিক। অথচ ১৪০০ বছর আগে জীবনের মূল উৎস পানি এমন তথ্য স্পস্টভাবে মানুষের জানা ছিল না। অনেকের মতে এই তথ্য বাইবেল থেকে নেয়া। অথচ বাইবেলে কোথাও সমস্ত প্রাণের উৎস পানি এমন কথা বলা হয় নি। আবার অনেকেই বলেন কুরআন থ্যালিস নামের একজন গ্রীক ফিলোসফারের তথ্য নকল করেছে। যিনি পানি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। অথচ থ্যালিস বলেছিলেন পানি হলো বিশ্বের সবকিছুর মূল উপাদান বা আদি কারণ (arche)। সমস্ত বস্তু যেমনঃ আকাশ, মাটি, আগুন, জীবন্ত প্রাণী — সবকিছুই পানি থেকে উদ্ভূত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত পানিতেই ফিরে যায়। পৃথিবী পানির উপর ভাসছে বলে তিনি মনে করতেন। কিন্তু কুরআনে থ্যালিসের এইসব ভুল ধারণাকে উল্লেখ করা হয় নি। যদি কুরআন থ্যালিসের তথ্য ধার করত তবে তার ভূল ধারণাগুলোও কুরআনে লিখা থাকতো।
কুরআনে ভ্রূণতত্ত্বঃ
কুরআনে এম্ব্রায়োলজি স্টেজ গুলো বর্ণনা করা হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন। অথচ সেই সময় ভ্রূণতত্ত্ব নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল । যেমন, অ্যারিস্টটল সহ অনেকের ধারণা ছিল — পুরুষের বীর্য মহিলার মাসিকের রক্তের সাথে মিশে “দই” বা “পনির” এর মতো জমাট বেঁধে ভ্রূণ তৈরি করে। ভ্রূণ তৈরীতে নারীর কোনো সক্রিয় ভূমিকা নেই। ভ্রূণ প্রথমে রক্ত জমাট বাঁধে, পরে মাংসপিণ্ড হয়। হৃদয় আগে তৈরি হয়।
হিপোক্রেটিস (৪৬০–৩৭৭ খ্রি.) ধারণা করতেন বীর্য শরীরের সব তরল থেকে আসে, প্রথমে মস্তিষ্ক, সেখান থেকে মেরুদণ্ড হয়ে কিডনি থেকে লিঙ্গ এ বীর্য আসে। তখনকার ধারণাগুলো ছিল অস্পষ্ট, কল্পনাপ্রসূত এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণহীন। গ্রিক চিকিৎসকদের (বিশেষ করে গ্যালেন ও অ্যারিস্টটল) কিছু ধারণা আরব বণিকদের মাধ্যমে ছড়িয়েছিল, কিন্তু সাধারণ আরবরা লোককথা ও কুসংস্কারেই বেশি বিশ্বাস করত। অথচ ভ্রূণতত্ত্ব নিয়ে এইসব ভুল ধারণার কোনটাই কুরআনে স্থান পায় নি, বরং কুরআনে সঠিকভাবে মানুষ গঠনের স্টেজগুলো বর্ণনা করেছে।
মানুষের আংগুলের ছাপঃ
কুরআনে মানুষের ফিংগারপ্রিন্ট বা আংগুলের ছাপের ধারণা দেয়া হয়েছে যা নিয়ে মানুষ কিছুই জানত না। “মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করতে পারব না? হ্যাঁ, আমি তার আঙ্গুলের অগ্রভাগসমূহ (বা ডগা/ফিঙ্গারটিপস) পর্যন্ত সঠিকভাবে পুনর্গঠন করতে সক্ষম।” (আল-ক্বিয়ামাহ ৭৫ঃ৩-৪)
আরবি শব্দ “বানানাহু” (بَنَانَهُ) অর্থ আঙ্গুলের ডগা বা অগ্রভাগ। মানুষের আঙ্গুলের ডগায় যে রেখা থাকে তাতে মানুষের পরিচয় লুকিয়ে থাকে এবং একজনের আঙ্গুলের রেখার সাথে আরেকজনের রেখার কোন মিল পাওয়া যায় না। প্রত্যেক মানুষের আঙ্গুলের ছাপ সম্পূর্ণ অনন্য — পৃথিবীর কোনো দুই ব্যক্তির এমনকি একই যমজেরও ছাপ হুবহু মিলে না। এইজন্য আঙ্গুলের রেখাকে ব্যক্তিগত পরিচয় নির্ধারণের (identification) জন্য ব্যবহৃত হয়। কুরআন নাজিলের সময় (৬১০-৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) আরব উপদ্বীপে বা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে আঙ্গুলের ছাপের বিষয়ে নিয়ে কোনো ধারণা বা জ্ঞান ছিল না। ১৯শ শতাব্দীতে সালে ফ্রান্সিস গলটন, উইলিয়াম হার্শেল, হেনরি ফল্ডস প্রমুখ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয় যে ছাপগুলো সম্পূর্ণ অনন্য ও স্থায়ী। এরপর থেকে ফরেনসিক ও পুলিশি ব্যবহার শুরু হয়।
কুরআনে বলা হয়েছে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য যার যার নিজস্ব কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে-
কুরআনে ১৪০০ বছর আগেই বলা হয়েছে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য যার যার নিজস্ব কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে। কুরআনে চাঁদ ও সূর্যের কক্ষপথ (orbit) নিয়ে যে আয়াতগুলো বলা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট হলো:
- সূরা আল-আম্বিয়া (২১:৩৩): “আর তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন, সূর্য ও চাঁদ। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে ভাসছে ।”
- সূরা ইয়াসিন (৩৬:৪০): “সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদকে ধরে ফেলা, আর রাতও দিনকে অতিক্রম করতে পারে না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে ভাসছে।”
এখানে “ফালাক” (falak) শব্দের অর্থ কক্ষপথ বা আকাশীয় গোলক, এবং “যাসবাহুন” শব্দের অর্থ “ভাসছে/সাঁতার কাটছে” — যা গতি ও নিয়মিত চলাচল নির্দেশ করে। শব্দটি গোলাকার ঘূর্ণন বা নির্দিষ্ট বৃত্তাকার পথ বোঝায়। দিন, রাত ঘটে পৃথিবীতে সাথে সূর্য ও চাঁদকে যোগ করা হয়েছে। তারমানে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্য যার যার নিজস্ব কক্ষপথে ভ্রমণ করছে বলে এখানে স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে। অথচ কুরআন নাযীলের সময় পৃথিবীকে স্থির (stationary) মনে করা হতো। মানুষ জানত না যে পৃথিবী ঘুরছে , বা সূর্যের নিজস্ব কক্ষপথ আছে। সাধারণ ধারণা ছিল: সূর্য ও চাঁদ আকাশে চলাফেরা করে, কিন্তু “কক্ষপথ” (orbit) বলতে আধুনিক অর্থে বোঝানো হতো না। টলেমি (২য় শতাব্দী) এর ভূকেন্দ্রিক মডেল (Geocentric model) সবচেয়ে প্রচলিত ছিল, যেখানে পৃথিবী কেন্দ্রে স্থির, সূর্য, চাঁদ ও গ্রহগুলো পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে।
এরিস্টার্কাস নামে একজন গ্রিক ৩য় শতাব্দীতে বলেছিলেন, সূর্য স্থির, আর গ্রহগুলো তার চারপাশে ঘুরছে, কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি। সাধারণ আরবদের কাছে এসব জ্ঞান খুব সীমিত ছিল। বেশিরভাগ লোক সূর্য-চাঁদকে দেবতা বা আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে চলমান মনে করত। তখনকার জ্ঞান অনুযায়ী পৃথীবি, চাঁদ, সূর্য যারা যার কক্ষপথে ঘুরছে এমনটা প্রচলিত ধারণার বাইরে।
সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বঃ
মহাবিশ্ব যে সম্প্রসারণশীল তা নিয়ে সরাসরি যে আয়াতটি কুরআনে উল্লেখ করা হয়, তা হলো সূরা আয-যারিয়াত (৫১:৪৭): “আমি আকাশকে আমার ক্ষমতাবলে নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি এর মহাসম্প্রসারণকারী ।” এখানে মূল শব্দ مُوسِعُونَ (মূসিউন) হলো و-س-ع (ওয়া-সীন-আইন) মূল থেকে গঠিত ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য (active participle)। এই মূলের অর্থ হলো প্রশস্ত করা, বিস্তার করা, প্রসারিত করা, স্থান প্রশস্ত করা। ব্যাকরণগতভাবে, إِنَّا لَمُوسِعُونَ গঠনটিতে জোরদারকারী লাম (لَ) এবং বর্তমান কালের ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য (present participle) ব্যবহৃত হয়েছে। এটি চলমান বা অব্যাহত ক্রিয়া বোঝাতে পারে — অর্থাৎ “আমি প্রসারকারী” বা “আমি তা প্রসারিত করছি” বা চলমান সম্প্রসারণ (ongoing expansion)।
১৯২৯ সালে এডউইন হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন যে গ্যালাক্সিগুলো একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে — অর্থাৎ মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। হাবলের এই আবিষ্কারের মূল ভিত্তি ছিল রেডশিফট (redshift)। গ্যালাক্সিগুলো থেকে আসা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল দিকে সরে যাওয়া দেখে বোঝা যায় যে, সেগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে , ডপলার প্রভাবের মতো। তিনি লক্ষ্য করেন যে, যত দূরের গ্যালাক্সি, তত দ্রুত গতিতে সেটি আমাদের থেকে সরে যাচ্ছে। এই সম্পর্ককে হাবলের সূত্র (Hubble’s Law) বলা হয় — বেগ = হাবল ধ্রুবক × দূরত্ব। এর আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন মহাবিশ্ব স্থির ও অপরিবর্তনীয়। হাবলের পর্যবেক্ষণ সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে দেয়। পরবর্তীতে এটি বিগ ব্যাং তত্ত্বের ভিত্তি হয়ে ওঠে — যে মহাবিশ্ব একসময় অত্যন্ত ঘন ও গরম অবস্থায় ছিল এবং তারপর থেকে প্রসারিত হচ্ছে।
আকাশ মানুষকে রক্ষা করে
পবিত্র কুরআন আকাশকে “সুরক্ষিত ছাদ” (protected canopy / well-guarded roof / protected ceiling) হিসেবে বর্ণনা করেছে। এটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে সূরা আল-আম্বিয়া (২১) এর ৩২ নম্বর আয়াতে: “আর আমি আকাশকে সুরক্ষিত ছাদ বানিয়েছি; অথচ তারা এর নিদর্শনসমূহ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।”
এছাড়াও সূরা বাকারার ২২ নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে “যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদ বানিয়েছেন, এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তা দ্বারা তোমাদের জন্য ফল উৎপন্ন করেন…
এখানে “সকফাম মাহফূজা” (saqfan mahfuzan) শব্দটি ব্যবহার হয়েছে।
- সকফ (saqf) = ছাদ, ছাউনি, canopy বা roof।
- মাহফূজ (mahfuz) = সুরক্ষিত, রক্ষিত, well-guarded।
আমরা যখন সাধারণভাবে আকাশের দিকে দেখি তথন এটিকে একটি নীল রঙের আবরণের মত মনে হয়, আকাশা আমদেরকে সূর্যের আলো, বৃষ্টি থেকে রক্ষা করছে বলে মনে হয় না। এরজন্য আমরা আকাশকে ছাদ হিসেবে উল্লেখ করি না। কিন্তু ১৪০০ বছর আগে যখন এই আয়াত নাজিল হয়, তখন আকাশকে “ছাদ” বলে বর্ণনা করা হয়েছে — যা আজকের বিজ্ঞানের সাথে অসাধারণভাবে মিলে যায়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল (atmosphere) আসলেই একটি সুরক্ষিত ছাদের মতো কাজ করে। এটি না থাকলে পৃথিবীতে জীবন অসম্ভব হতো। আকাশের ওজোন স্তর (Ozone layer) সূর্যের ক্ষতিকর UV রশ্মি শোষণ করে। এটি না থাকলে ত্বকের ক্যান্সার, ফসলের ক্ষতি ও জীবন ধ্বংস হতো। বেশিরভাগ উল্কা বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। না হলে প্রতিদিনই বৃষ্টির মতো উল্কা পড়ত। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র (magnetic field) এবং বায়ুমণ্ডল একসাথে চার্জযুক্ত কণা ও ক্ষতিকর রশ্মি প্রতিহত করে। বায়ুমণ্ডল তাপ ধরে রাখে (greenhouse effect) এবং অতিরিক্ত ঠান্ডা-গরম থেকে রক্ষা করে। অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ইত্যাদি ধরে রাখে এবং পানির চক্র বজায় রাখে। এত বিস্তারিত জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও আকাশকে ছাদ হিসেবে উল্লেখ করাটা বিস্ময়কর।
কুরআনে দুই সাগরের মাঝে ব্যবধান (barrier) এর কথাঃ
সূরা আল-ফুরকান (২৫ঃ৫৩) “তিনিই দুই সাগরকে মিলিত করেছেন — এটি মিষ্টি ও সুপেয়, ওটি লবণাক্ত ও তিক্ত। তাদের মাঝে একটি ব্যবধান ও আড়াল স্থাপন করেছেন।”
আরবি শব্দ “বারযাখ” (برزخ) অর্থ একটি ব্যবধান, পর্দা বা অদৃশ্য বিভাজক যা দুটি জিনিসকে আলাদা রাখে। আয়াতে “মারাজা” শব্দের অর্থ ছেড়ে দেওয়া বা মিলিত হতে দেওয়া।
কুরআন নাযীল হয়েছিল ঊষর মরুভূমির মাঝে। সেখানে দুই সাগরের পানির প্রবাহের মধ্যে যে ব্যাবধান আছে, এমন তথ্য কারোরি যানা ছিল না। তারচেয়েও বিস্ময়কর হচ্ছে দুই সাগরেরে পানি যে মেশে না তার কারণ হিসেবে লবণাক্ততার পার্থক্যের কথা বলা হয়েছে। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান (oceanography) অনুযায়ী বিভিন্ন সাগরের মিলনস্থলে লবণাক্ততা (salinity), ঘনত্বের পার্থক্য (density difference), তাপমাত্রার পার্থক্যের জন্য এবং হ্যালোক্লাইন (halocline) নামক একটি স্তর তৈরি হয়, যা পানিকে পুরোপুরি মিশতে দেয় না। ফলে এক সাগরের পানি অন্যটির উপরে বা নিচে আলাদা স্তরে থাকে। বিষয়টি অবাক হবার মত যে ১৪০০ বছর আগে আরব মরুভূমির বুকে নাযীল হওয়া একটি বইতে লবণাক্ততা বা Salinity এর পার্থক্যের জন্য যে পানি একটি অপরের সাথে মিশে না এমন তথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে।
সমুদ্রের পানি আর স্থলের অনুপাতঃ
কুরআনে অনেক এমন অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য লুকায়িত অবস্থায় আছে যা নিয়ে তখনকার মানুষের কোন ধারণাই ছিল না। যেমনঃ পৃথিবীর সমুদ্র আর ভূমির অনুপাত ৭০% আর ৩০% । অদ্ভতভাবে কুরআনে Singular form ‘সাগর’ (আল-বাহর): শব্দটি এসেছে ৩২ বার। ‘স্থল’ (আল-বার): শব্দটি এসেছে ১৩ বার।
এই দুটি সংখ্যা যোগ করলে মোট সংখ্যা হয় ৪৫। এরপর শতকরা অনুপাত হিসাব করলে দেখা যায়:
৩২ (সাগর/আল-বাহর) + ১৩ (স্থল/আল-বার) = ৪৫। শতকরা অনুপাত:
- সাগরের অনুপাত = (৩২ ÷ ৪৫) × ১০০ = ৭১.১১% (প্রায় ৭১%)
- স্থলের অনুপাত = (১৩ ÷ ৪৫) × ১০০ = ২৮.৮৯% (প্রায় ২৯%)
এটি পৃথিবীর সমুদ্র (পানি) এবং স্থলভাগের আধুনিক অনুমানিত অনুপাতের (প্রায় ৭১% পানি ও ২৯% স্থল) সাথে খুব কাছাকাছি মিলে যায়।
লোহা পৃথিবীর মাঝখানে এবং লোহাকে নাযীল করা হয়েছেঃ
কুরআনে ‘লোহা’ বা ‘হাদীদ’ নামে একটি সূরা আছে, সূরা হাদীদ বা লোহা হচ্ছে কুরআনের ৫৭ নাম্বার সূরা যার অবস্থান প্রায় মাঝখানে। কুরআনে ১১৪ টি সূরা আছে যার ৫৭ হচ্ছে অর্ধেক বা মাঝখানের নাম্বার। পৃথিবীর ভেতরের কেন্দ্রে বা মাঝখানেও প্রায় ১৩০০ কিমি লোহার কেন্দ্র আছে।
সূরা আল–হাদীদ ( ৫৭ নম্বর সূরা), ২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে। আয়াতটি হলো:“…আর আমি নাযিল করেছি লোহা, যাতে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ…” (সূরা হাদীদ, আয়াত: ২৫)।
কুরআনে লোহা সম্পর্কে বলা হয়েছে লোহাকে “নাযিল” বা “অবতীর্ণ” করা হয়েছে, অর্থাৎ লোহা পৃথিবীর নিজস্ব কোন উপাদান নয়, এটি Extra-terrestrial পৃথিবীর বাইরে থেকে পৃথিবীতে এসেছে। মহাকাশবিদদের মতে লোহা নক্ষত্র বা সুপারনোভার বিষ্ফোরণের ফলে সুপারনোভা থেকে পৃথিবীতে এসেছে। অর্থাৎ লোহা বাইরের উপাদান, যেমনভাবে উল্কাপিন্ড পৃথিবীর বাইরে থেকে পৃথিবীতে এসে পড়ে লোহাও তেমনিভাবে এসেছে। তাই লোহার ব্যাপারে “নাযিল” শব্দটি ব্যাবহার করা হয়েছে। কিন্তু মানুষ তো এসব বিষয় তখন জানতো না , তাহলে কেন লোহাকে ‘ নাযীল’ করা হয়েছে বলা হয়েছে?
সৌর আর চন্দ্র বছরের মধ্যে পার্থক্যঃ
পবিত্র কুরআনের সূরা কাহফে একদল বিশ্বাসী যুবকের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, যারা একটি গুহায় দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে ছিলেন।
সূরা কাহফের ২৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাদের অবস্থানের সময়কাল সম্পর্কে বলেছেন: “তারা তাদের গুহায় তিনশত বছর অবস্থান করেছিল এবং এর সাথে আরও অতিরিক্ত নয় বছর ।” (সূরা কাহাফ: ২৫)
আয়াতে ৩০০ বছর আর ৯ বছর সংখ্যা দুটিকে আলাদা করা হচ্ছে, কারণ, পৃথিবীতে সাধারণত সময়ের হিসাবের জন্য আমরা দুটি ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি:
১. সৌর বর্ষ (Solar Calendar): যা ৩৬৫ দিনে এক বছর হয়।
২. চন্দ্র বর্ষ (Lunar Calendar): যা প্রায় ৩৫৪ দিনে এক বছর হয়।
সৌর ও চন্দ্র বর্ষের ব্যবধান
জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুযায়ী, প্রতি ১ সৌর বছর ও ১ চন্দ্র বছরের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ১১ দিনের। এই ব্যবধান জমতে জমতে প্রতি ১০০ সৌর বছরে চন্দ্র বর্ষে ৩ বছর বেড়ে যায়। সেই গাণিতিক হিসেবে:
১০০ সৌর বছর = ১০৩ চন্দ্র বছর।
৩০০ সৌর বছর = ৩০৯ চন্দ্র বছর।
অর্থাৎ, গুহাবাসীরা যদি সৌর ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৩০০ বছর ঘুমিয়ে থাকেন, তবে চন্দ্র ক্যালেন্ডার বা হিজরি হিসাব অনুযায়ী সেই সময়কালটি দাঁড়ায় আরও ৯ বছর বেশী ঠিক ৩০৯ বছর।
কুরআনের ম্যাথেমেটিক্যাল বিন্যাসঃ
কুরআনে জোড় এর বেজোড় সংখ্যা নিখুঁত সামঞ্জস্য।
সূরা ফজরের ৩ নাম্বার আয়াতে একটি অদ্ভত ধরণের শপথ করা হয়েছে- সেটি হচ্ছে জোড় আর বেজোড় সংখ্যার শপথ
জোড় ও বেজোড়ের শপথ,
And [by] the even [number] and the odd
সাম্প্রতিক গবেষণায় কুরআনের ১১৪টি সূরার ক্রমিক নম্বর এবং আয়াত সংখ্যার মধ্যে জোড় আর বেজোড়ের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য গাণিতিক ভারসাম্য বা Perfect Symmetry লক্ষ্য করা গেছে, যা কোনো মানুষের পক্ষে পরিকল্পনা করা প্রায় অসম্ভব।
কুরআনের মোট সূরার সংখ্যা ১১৪টি। এই সূরাগুলোকে যদি আমরা আয়াত সংখ্যার ভিত্তিতে দুই ভাগে ভাগ করি, তবে নিচের চমৎকার চিত্রটি ফুটে ওঠে:
১. জোড় আয়াত সংখ্যা বিশিষ্ট সূরা (৬০টি): কুরআনের এমন ৬০টি সূরা আছে যাদের মোট আয়াত সংখ্যা একটি জোড় সংখ্যা। বিস্ময়কর বিষয় হলো:
-
এই ৬০টি সূরার মধ্যে ৩০টির ক্রমিক নম্বর (Serial No.) জোড়।
-
বাকি ৩০টির ক্রমিক নম্বর বেজোড়।
২. বেজোড় আয়াত সংখ্যা বিশিষ্ট সূরা (৫৪টি): বাকি ৫৪টি সূরার মোট আয়াত সংখ্যা বেজোড়। এখানেও দেখা যায় গাণিতিক সমতা:
-
এই ৫৪টি সূরার মধ্যে ২৭টির ক্রমিক নম্বর জোড়।
-
বাকি ২৭টির ক্রমিক নম্বর বেজোড়।
পরিসংখ্যান বা সম্ভাব্যতা তত্ত্বের (Probability Theory) দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, ১১৪টি সূরার ক্রমিক নম্বর এবং আয়াত সংখ্যা এভাবে ঠিক ৫০%-৫০% অনুপাতে মিলে যাওয়া অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
সাধারণভাবে যদি সূরার ক্রম বা আয়াতের বিন্যাস দৈবক্রমে (randomly) হতো, তবে জোড় ও বেজোড় সিরিয়াল নম্বরের মধ্যে এমন নিখুঁত অর্ধেক ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআনের এই বিন্যাস কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যমূলক বিন্যাস (Intentional Pattern)।
——————————————————————————————————————————————————
এভাবে কুরআনের অলৌকিকতা নিয়ে পাতার পর পাতা লিখা যায়।
কাজেই উপরের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত যাচ্ছে যে কুরআন আদৌ মুহাম্মাদ সাঃ এর নিজের রচনা করা কোন বাণী নয়। বরং কুরআন একজন সর্বজ্ঞাতা , মহান স্রষ্ঠার বাণী, যা তিনি নবী মুহাম্মদ সাঃ এর উপরে নাযীল করেছিলেন। এই গ্রন্থটি সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযীল করা হয়েছে, এবং এটি মানুষের জন্য আলো, হেদায়েত এবং চির মুক্তির জন্য পথপ্রদর্শক । আল্লাহ আমাদেরকে এই সত্য উপলব্ধি করার তৌফিক দান করুন। আমিন।