কুরআনে ভ্রূণ বিকাশের ধাপসমূহ, আধুনিক ভ্রূণতত্ত্ব ও প্রাচীন গ্রীক ভুল ধারণা
আধুনিক ভ্রূণতত্ত্ব অনুযায়ী মায়ের গর্ভে শিশু বিকাশ লাভ করে কয়েকটি ধাপে। প্রথমে শুক্রাণু আর ডিম্বাণুর মিলনের মাধ্যমে জাইগোট বা বহুকোষী স্ট্রাকচার তৈরী হয়। সেটি জরায়ূর দেয়ালে আটকে যায় এবং জরায়ূ থেকে রক্ত সরবরাহ পেতে থাকে। ধীরে ধীরে হার্ট, কিডনী, ব্রেইন তৈরী হয়ে একটি অপুর্নাংগ শিশুর আকৃতি তৈরী হয়। শেষে হাত, পা, মেরুদন্ড, মাংশপেশীর বিকাশ সাধন হলে সেটি একটি পুর্নাংগ শিশুর আকৃতি ধারণ করে। কুরআনে এই পরিবর্তনগুলোর সংক্ষেপে বর্ণনা দেয়া হয়েছে এবং বিস্ময়করভাবে এই ধাপগুলোর সাথে ভ্রূণতত্ত্বের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কুরআনে শুধু মানব বিকাশ নয় বরং মানুষের শরীরের মূল গঠন উপাদানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
মানুষের ভ্রূণ কিভাবে মাতৃগর্ভে বিকাশ লাভ করে তার মূল বর্ণনাটি সূরা আল-মু’মিনুন (২৩:১২-১৪) এ এসেছে:

“আর নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে। এরপর তাকে একটি নিরাপদ স্থানে রাখলাম একটি ফোঁটা (নুতফা) রূপে। তারপর ফোঁটাকে করেছি ‘আলাকা’। তারপর সেই আলাকাকে করেছি ‘মুদগাহ’। এরপর মাংসপিণ্ডে গঠন করেছি অস্থি, তারপর অস্থিকে ঢেকে দিয়েছি মাংস দ্বারা। তারপর আমরা তাকে একটি অন্য এক সৃষ্টি হিসেবে রূপান্তর করেছি। অতএব আল্লাহ কতই না বরকতময়, সৃষ্টিকর্তাদের মধ্যে সর্বোত্তম।”
(সূরা আল-মু’মিনুন ২৩:১২-১৪)।
এই আয়াতে মানুষ সৃষ্টির কয়েকটি ধাপের কথা বলা হয়েছে-
প্রথমেই বলা হয়েছে মানুষের শরীরের মূল গঠন উপাদান নিয়ে- “আর নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস (سُلَالَةٍ ) থেকে।” অর্থাৎ মানুষের শরীরের মূল উপাদান হচ্ছে মাটির সারাংশ।
সুলালাহ” سُلَالَةٍ শব্দটির অর্থ “নির্যাস” বা “সারাংশ” – Extract / Essence / Quintessence / Refined part এরাবিক অভিধান Lisān al-ʿArab এ বলা হয়েছে- السُّلَالَةُ: ما استُخلِصَ من الشيء ونُزِعَ منه
অর্থ: কোনো কিছুর মধ্য থেকে যা নিষ্কাশন বা পরিশোধন করে বের করা হয়। মানুষের দেহে যে মৌলিক উপাদানগুলো হচ্ছে— ক্যালসিয়াম, লোহা,পটাশিয়াম, সোডিয়াম, ফসফরাস, অক্সিজেন, কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন ইত্যাদি। এদের মধ্যে অক্সিজেন, কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজনে এই চারটি যৌগ শরীরের ৯৬% গঠন করে। এসব উপাদানই মূলত মাটিতে বিদ্যমান খনিজ পদার্থ। উদ্ভিদ মাটি থেকে এগুলো গ্রহণ করে। মানুষ খাদ্যের মাধ্যমে তা গ্রহণ করে। মানুষের শরীরে যে প্রোটিন, লিপিড, নিউক্লিক এসিড থাকে তাদের গঠন উপাদান হচ্ছে কার্বন, হাইড্রজেন, নাইট্রজেন, ফসফরাস, অক্সিজেন ইত্যাদি মৌলিক কণা। ফলে মানুষ প্রকৃত অর্থেই “মাটির নির্যাস” থেকে গঠিত।
কুরআন অনুযায়ী গির্ভে মানুষ সৃষ্টির মূল ধাপগুলো:
- নুতফা (نطفة) – একটি ফোঁটা তরল (শুক্রাণু/ভ্রূণ)
- ‘আলাকা (علقة) – জমাটদ্ধ, ঝুলে থাকা, জোঁকের মতো
- মুদগাহ (مضغة) – চিবানো/ অপূর্নাংগ মাংসপিণ্ড
- হাড়ের সৃষ্টি (عِظَام)- হাত, পা, মেরুদন্ড তৈরী
- হাড়ের ওপর মাংসের আবরণ (لَحْم)- হাত, পা, মেরুদন্ডের চারিদিকে মাংসের আবরণ তৈরী
- অন্য এক সৃষ্টিতে রূপান্তর – ( خَلۡقًا اٰخَرَ) ؕ- পূর্ণাংগ শিশুর কাঠামো।
আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা
এখানে বলে রাখা ভাল কুরআনে ভ্রূণতত্ত্ব একেবারে ডিটেইলস আলোচনা করা হয় নি, বরং বিভিন্ন স্টেজে ভ্রূণ দেখতে কিরকম হয় তার ফিজিক্যাল রূপের কথা কেবল উল্লেখ করা হয়েছে, যার সাথে মানব ভ্রূণতত্ত্বের মিল খুজে পাওয়া যায়-
১। কুরআনে প্রথম ধাপটিকে নুতফা বলা হয়েছে। নুতফা (نطفة) শব্দের অর্থ – একটি ফোঁটা তরল , শুক্রাণু/ভ্রূণ । এরপর তাকে একটি নিরাপদ স্থানে রাখলাম একটি ফোঁটা (নুতফা) রূপে। এখানে নিরাপদ স্থান বলতে জরায়ূকে বোঝান হয়েছে। নুতফা বা শুক্রাণু মায়ের গর্ভে স্থাপিত হলে তবেই মানব সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়।

ছবিঃ জরায়ূর ভেতরে নুতফা বা শুক্রাণু স্থাপিত হলে মানব সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মেডিকেল সাইন্সের তথ্য অনুযায়ী জরায়ূর ভেতরে শুক্রাণু এবং ডিম্বানুর মিলনের মাধ্যমে জাইগোট নামক একটি কোষ তৈরী হয়।জাইগোট নামক একটি কোষের স্ট্রাকচারটি থেকে ধীরে ধীরে ২ টি কোষ গঠিত হয়, ২টি থেকে ৪টি, ৪ টি থেকে ১৬টি , ৩২ টি গাণিতিকভাবে কোষের সংখ্যা বাড়তে থেকে। এমব্রায়োলজির ভাষায় এটিকে মরুলা (Morula) বলা হয়, যেটি ত। এসময়ে এটি প্রথমে গর্ভনালীর মুখে ভাসমান অবস্থায় থাকে এবং সেখান থেকে গর্ভাশয়ের ভেতরের দিকে যেতে থাকে।

ছবিঃ নুতফা বা শুক্রাণু , ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হলে ১টি থেকে ২টি, ২টি থেকে ৪টি, ৪টি থেকে ১৬টি এভাবে কোষের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
২। কুরআনে বর্ণিত এর পরের ধাপটি হচ্ছে ‘আলাকা (علقة) – যার অর্থ ঝুলে থাকা, আটকে থাকা, জোঁকের মত, জমাটদ্ধ। বহুকোষী স্ট্রাকচারটির কোষের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেলে তাকে ব্লাস্টোসিস্ট (Blastocyst) বলা হয় এবং ৬ষ্ঠ বা ৭ম দিনে এটি জরায়ূর দেয়ালে আটকে যায়, ১০ম দিনে এটি পুরোপুরিভাবে জরায়ূর দেয়ালের ভেতরে ঢুকে যায়। ১২ তম দিনে জরায়ূর রক্ত থেকে রক্ত সরবরাহ পেতে থাকে। এবং জোক যেমন রক্ত চোষণ করে তেমনি এটি জরায়ূ থেকে রক্ত সরবরাহ পেতে থাকে এবং বড় হতে থাকে। কুরআনে এই ধাপটিকে আলাকা বলা হয়েছে। পুরা এই প্রক্রিয়াকে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় Implantation.
বিভিন্ন ধরণের কুরআনের অনুবাদ গ্রন্থে “আলাকা” শব্দটিকে জমাট বাধা রক্ত হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে, যেটি পুরোপুরি সঠিক নয়, বরং প্রকৃত অর্থ হবে ঝুলে থাকা, আটকে থাকা, জোঁকের মত, জমাটদ্ধ ইত্যাদি।

ছবিঃ ‘আলাকা’ গর্ভের দেয়ালে আটকে যায় এবং সেখান থেকে রক্ত সরবরাহ পেতে থাকে থাকে।
৩। পরের ধাপ হচ্ছে مضغة যার অর্থ হচ্ছে অপূর্নাংগ একটি মাংশের টুকরা, – A small piece of flesh/meat (the amount that fits in the mouth to be chewed), usually used to indicate small quantity or early/incomplete form.
ব্লাস্টোসিস্ট (Blastocyst) কোষগুলো ধীরে ধীরে তিনটি স্তরে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রতিটি স্তর থেকে আলাদা আলাদা অঙ্গ – প্রত্যঙ্গ যেমন: হৃৎপিণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র তৈরী হতে শুরু করে। এটিকে দেখতে অপূর্নাংগ একটি শিশুর মত দেখায়, কারণ তখনও হাত, পা, মস্তিষ্ক, চোখ পূর্ণ রুপে বিকাশ লাভ করে নি। এজন্য এটিকে مضغة বা অপূর্নাংগ মাংশের টুকরা বা দাঁত দিয়ে চাবানো টুকরার মত বলা হয়েছে।

ছবিঃ ‘আলাকা’ ধীরে ধীরে একটি অপূর্নাংগ শিশুর আকৃতি ধারণ করে যাকে مضغة বলা হয়। এর কোন হাত-পা থাকে না, তাই একে অপূর্নাংগ মাংশের টুকরা বা দাঁত দিয়ে চাবানো টুকরার মত বলা হয়েছে।
৪। কুরআনে পরের ধাপটিকে হাড়ের সৃষ্টি (عِظَام) বলা হয়েছে। ৪র্থ সপ্তাহের শুরুতে নরম হাড্ডির কাঠামো তৈরী হয়, মানুষের হাত-পা, মেরুদন্ড তৈরী হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ৭ম থেকে ৮ম সপ্তাহের মধ্যে মানুষের শরীরের শক্ত হাড্ডির কাঠামোতে পরিণত হতে থাকে।

ছবিঃ মুদগার মধ্যে আস্তে আস্তে হাত, পা মেরুদন্ড তৈরী হতে শুরু করে, প্রথমে নরম হাড্ডি ও পরে শক্ত হাড়ের সৃষ্টি হয়। যার উপরে মাংশের অবরণ তৈরী হয়।
৫। ৪র্থ থেকে ৫ম সপ্তাহে মানুষের শরীরের মাংশপেশীর তৈরী হতে শরু করে। ৫ম থেকে ৬ষ্ঠ সপ্তাহের দিকে মাংশপেশীর কোষগুলো হাড্ডির চারিদিকে পেশীর কাঠামো তৈরী করতে থাকে। কুরআনে এই ধাপটিকে মুদ্গাহ বলা হয়েছে। হাড়ের ওপর মাংসের আবরণ (لَحْم) বলা হয়েছে।
পঞ্চম সপ্তাহ থেকে এই স্থানান্তর এবং কোষের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায় [১.৩.৩]। সাধারণত ষষ্ঠ সপ্তাহের (৩৬ দিন) মধ্যে মায়োব্লাস্টগুলো লিম্ব বাড-এ প্রবেশ করে ডরসাল এবং ভেন্ট্রাল পেশী স্তূপ গঠন করে
এখানে উল্লেখ্য হাড় এবং মাংশপেশীর বিকাশ প্রায় একই সময়ে শুরু হয়, কিন্তু
৬। গর্ভের প্রায় ৮ সপ্তাহের মধ্যে শিশুর দেহের সব অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ, হাত-পা, মস্তিষ্ক, হৃদপিন্ড, কিডনী তৈরী হয়ে যায় এবং শিশুটি প্রায় ৯ মাস ধরে মায়ের গর্ভে বড় হতে থাকে। কুরআনে এই ধাপটিকে অন্য এক সৃষ্টিতে রূপান্তর বলে অভিহিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ- নুতফা / শুক্রাণু–> জরায়ূর নিরাপদ স্থানে –> আলাকা / জাইগোট / মরুলা জরায়ূর দেয়ালে আটকে যাওয়া–> মুদগাহ বা হাত-পা-মেরুদন্ড বিহীন অপুর্নাংগ কাঠামো তৈরী–> ইযাম এবং লাহাম / হাত-পা-মেরুদন্ড তৈরী হওয়া–> পূর্নাংগ শিশু/ নতু সৃষ্টি।
| ক্রম | কুরআনের পর্যায় (Quranic Stage) | ক্রমবৈজ্ঞানিক ধাপ (Medical / Embryology) | সময়সীমা (দিন / সপ্তাহ) | বিস্তারিত বর্ণনা (সংক্ষেপে) |
|---|---|---|---|---|
| ১ | নুতফা (نطفة / Nutfah) | জাইগোট → ক্লিভেজ → মরুলা (Zygote → Cleavage → Morula) | দিন ১ → দিন ৪–৫ (মরুলা: দিন ৪) | শুক্রাণু + ডিম্বাণু → জাইগোট → ২, ৪, ৮, ১৬, ৩২ কোষ… গাণিতিক বৃদ্ধি → ছোট বলের মতো কোষগুচ্ছ |
| ২ | আলাকা (علقة / Alaqah) | ব্লাস্টোসিস্ট → ইমপ্লান্টেশন (Blastocyst → Implantation) | দিন ৫–৬ → দিন ৬–৭ → দিন ১০ → দিন ১২ | ব্লাস্টোসিস্ট জরায়ুর দেয়ালে আটকে যায়, রক্ত গ্রহণ করে → জোকের মতো ঝুলে থাকা / রক্তসংগ্রহের অবস্থা |
| ৩ | মুদঘা (مضغة / Mudghah) | গ্যাস্ট্রুলেশন → তিন স্তর (Ectoderm, Mesoderm, Endoderm) | সপ্তাহ ৩ (দিন ১৫–২১) → সপ্তাহ ৪ শুরু | তিন জার্ম লেয়ার গঠন → হৃদয়, স্নায়ু, পরিপাকতন্ত্রের প্রাথমিক সূচনা → চিবানো মাংসের টুকরোর মতো আকৃতি |
| ৪ | হাড়ের সৃষ্টি (عِظَام / Izam) | কার্টিলেজ মডেল → হাড়ের কাঠামো (Skeletal framework) | সপ্তাহ ৪–৫ → সপ্তাহ ৬–৮ | হাত-পা ও নরম হাড়ের কাঠামো → ধীরে ধীরে শক্ত হাড়ের ফ্রেম তৈরি |
| ৫ | মাংসের আবরণ (لَحْم / Lahm) | মাংসপেশী গঠন (Myogenesis) | সপ্তাহ ৪–৫ শুরু → সপ্তাহ ৬–৮ | হাড়ের চারপাশে মাংসপেশী তৈরি → হাড় + মাংস দ্বারা দেহের আকার স্পষ্ট |
| ৬ | অন্য সৃষ্টিতে রূপান্তর (Different creation) | ভ্রূণ পর্যায় শেষ → ফেটাস পর্যায় | সপ্তাহ ৮ শেষ → ৯ম সপ্তাহ থেকে জন্ম পর্যন্ত | সব প্রধান অঙ্গ সম্পূর্ণ → মানবাকৃতি স্পষ্ট, বৃদ্ধি ও পরিপক্বতা |
আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞান, যা মাইক্রোস্কোপ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে গঠিত, এই ধাপগুলোর সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়:
Embryology এর ভাষায় নুতফা এবং আলাকা ধাপ পর্যন্ত অংশটিকে বলা হয় – Pre-embryonic stage, যেটি হচ্ছে মায়ের গর্ভে প্রথম ২ সপ্তাহ। মুদগা, ইযাম আর লাহাম ধাপকে বলা হয় Embryonic stage, যেটি হচ্ছে মায়ের গর্ভে প্রথম ৩য় থেকে ৮ম সপ্তাহ। শেষ বা খলিকিন ধাপটিকে বলা হয় Fetus বা পূর্নাংগ শিশু, যেটি হচ্ছে মায়ের গর্ভে ৮ম সপ্তাহ থেকে শিশু জন্ম নেয়া পর্যন্ত।
কুরআনে মানব ভ্রূণের যে বিকাশধাপ বর্ণিত হয়েছে, তা ভাষাগতভাবে ও বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এটি আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি কুরআনের অলৌকিকতার প্রমাণ বহন করে।
অনেকেই বলে থাকেন কুরআনে ভ্রূণতত্ত্ব প্রাচীন গ্রীকদের থেকে নেয়া হয়েছে এবং কুরআনে কপি করা হয়েছে। এখন দেখা যাক ভ্রূণতত্ত্ব সম্পর্কে প্রাচীন গ্রীকদের কি ধারণা ছিল-
হিপোক্রেটিস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০–৩৭০): On the Nature of the Child নামক রচনায় হিপোক্রেটিস বর্ণনা করেছেন যে শুক্রাণু (sperm) প্রত্যেক পিতামাতার সমস্ত শরীর থেকে উৎপন্ন হয়, এবং শক্তিশালী অংশগুলি থেকে আরও শক্তিশালী শুক্রাণু উৎপন্ন হয়। ভ্রূণ গঠিত হয় পুরুষের বীর্য এবং নারীর অবদানের (প্রায়শই মাসিক রক্ত হিসেবে বিবেচিত) মিশ্রণ থেকে। বিকাশ ঘটে পর্যায়ক্রমে: বীজটি একটি ঝিল্লিতে আবদ্ধ থাকে এবং মায়ের রক্ত জরায়ুতে নেমে আসার ফলে বৃদ্ধি পায়, যার ফলে মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। মাংস গঠিত হয় জমাট বাঁধা রক্ত থেকে, নাভির মাধ্যমে, এরপর হাড় শক্ত হয় গাছের ডালের মতো। শ্বাস (breath) ভূমিকা পালন করে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গঠনে।
অ্যারিস্টটল (খ্রিস্টপূর্ব ৩৮৪–৩২২): On the Generation of Animals গ্রন্থে অ্যারিস্টটল বিস্তারিতভাবে এপিজেনেসিস (epigenesis) তত্ত্ব বর্ণনা করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে ভ্রূণ উৎপন্ন হয় পুরুষের বীর্য মায়ের মাসিক রক্তের (মায়ের প্রদানকৃত “উপাদান”) উপর কাজ করে, যেমন দইয়ের মতো দুধ জমাট বাঁধে। পর্যায়গুলির মধ্যে রয়েছে: প্রাথমিক স্থিরীকরণ এবং কঠিন-তরল অংশের বিভাজন, ঝিল্লি (choria) গঠন; হার্ট থেকে রক্তনালী নাভির মাধ্যমে জরায়ুর সাথে যুক্ত হয়ে পুষ্টি সরবরাহ; হৃদয়ের মতো অঙ্গ প্রথমে আবির্ভূত হয়। মাংস এবং হাড় গঠিত হয় পৃথিবী উপাদানের সাথে পানি বা বায়ু মিশ্রিত হয়ে। স্নায়ু গঠিত হয় পৃথিবী ও বায়ু থেকে, নখ জমাট পানি থেকে, হাড় পৃথিবী ও পানি থেকে।

ছবিঃ গ্যালেন, তিনি মনে করতেন শুক্রাণু মাসিকের রক্তের সাথে মিশে ভ্রূণ তৈরী হয়।
গ্যালেন (১২৯–খ্রিস্টাব্দ ২১৬): গ্যালেন বিশ্বাস করতেন যে ভ্রূণ গঠিত হয় পুরুষের বীর্য (semen) এবং নারীর মাসিক রক্ত (menstrual blood) মিশে, যাকে তিনি “female semen” বলে মনে করতেন এই ধারণাটিকে বলা হয় two-seed theory। নারীর অবদানকে তিনি পুরুষের মতো সক্রিয় বলে মনে করেননি—নারীর রক্ত শুধু “উপাদান” (material) প্রদান করে, পুরুষের বীর্য “আকার” (form) দেয়। গ্যালেন বলতেন যে ভ্রূণ গর্ভাশয়ের ডান দিকে থাকলে পুরুষ হয় (heat-এর কারণে), বাম দিকে থাকলে হয় নারী। তিনি মনে করতেন নারীর শরীর হলো অসম্পূর্ণ বা দুর্বল পুরুষ শরীর।
On Semen গ্রন্থে গ্যালেন হিপোক্রেটিক এবং অ্যারিস্টটলীয় ধারণাগুলি সংশ্লেষণ করে সম্প্রসারিত করেছেন, চারটি পর্যায় প্রস্তাব করেছেন: বীর্য বীজ হিসেবে জরায়ুতে মাসিক রক্তের সাথে মিশে যায়; এই মিশ্রণ থেকে প্রাথমিক গঠন; মাংস, অঙ্গ এবং হাড়ে ধীরে ধীরে পার্থক্যকরণ; চূড়ান্ত শক্ত হওয়া। তিনি ভ্রূণকে মায়ের রক্তের মাধ্যমে রক্তনালী দিয়ে পুষ্টি প্রাপ্ত বলে বর্ণনা করেছেন, হাড় গঠিত হয় পৃথিবী অংশ থেকে এবং তার চারপাশে পেশী।
উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ভ্রূণতত্ত্ব নিয়ে প্রাচীন গ্রীকদের ধারণা ছিল অসংখ্য ভুলে ভরা। তারা সবাই ভাবতেন পুরুষের শুক্রাণু মেয়েদের মাসিকের রক্তের সাথে মিশে সন্তান জন্ম নেয়। অথচ কুরআনে এরকম ভুল তথ্য দেয়া হয় নাই। কুরআন যদি গ্রীকদের থেকে তথ্য ধার করত তবে তাদের ভুল ধারণাগুলোও কুরআনে লিখা থাকত। বরং কুরআনে মায়ের গর্ভে কিভাবে পর্যায়ক্রমে বড় হয় তারা ফিজিক্যাল ক্রম ধারাটি বর্ণনা করা হয়েছে সঠিকভাবে।
References:
Tortora & Derrickson
Principles of Anatomy and Physiology, 16th Edition- (Elements of human body: C, H, O, N, Ca, P, K, Na, Fe)।
Hippocrates–On the Nature of the Child, Hippocratic Corpus
Aristotle– On the Generation of Animals, Book II–IV
Galen – On Semen, On the Formation of the Foetus
Related post-